info@first-finance.com.bd   
  EMI Calculator  09678-888999

গ্যাস-বিদ্যুৎ দিলে আরও শক্ত হবে অর্থনীতি


মো. মহসিন মিয়া। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের পরিচিত মুখ। যেকোনো ব্যাংক সমস্যার সম্মুখীন হলে তাকেই সবার আগে ডাক পড়ে। মহসিনও হাসি মুখে তা সমাধান করে দেন। নারায়ণগঞ্জের নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা এই মানুষটি জীবনের প্রতিটি ধাপে রেখে চলেছেন মেধার স্বাক্ষর। ছাত্রজীবনে সব সময় ছিলেন সেরার কাতারে।কর্মজীবনেও সেটিই ধরে রেখেছেন। শুধুমাত্র আগ্রহ থেকে একজন ব্যক্তি কীভাবে একটি সেক্টরের আইকন হতে পারেন, তা মহসিন মিয়াকে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে সোনালী ব্যাংক দিয়ে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে কর্মজীবন শুরু মহসিন মিয়ার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। নিজের যোগ্যতা, মেধা আর একাগ্রতা দিয়ে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি মহসিন মিয়া কাজ করেছেন ইন্দো-সুয়েজ ব্যাংকে। বর্তমানে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও সিইও’র দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। কাজপ্রিয় মানুষটি মুখোমুখি হয়েছিলেন পরিবর্তন ডটকম’র। সেখানে তিনি বলেছেন, তার স্বপ্নের কথা, শিক্ষিত বেকার তরুণ নিয়ে।
কথপোকথনে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, পুঁজিবাজারের নানা সমস্যা, সম্ভাবনার নিখুঁত বর্ণনাও উঠে এসেছে। মহসিন মিয়ার নিজের মুখেই শুনুন, দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিবাজার নিয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ। গুণী এই মানুষটির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পরিবর্তন ডটকম’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফরিদ আহমেদ ও নিজস্ব প্রতিবেদক জাহিদ সুজন। ছবি তুলেছেন ফটোসাংবাদিক ওসমান গণি।


বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে বলে আপনি মনে করেন?
সত্যিকার অর্থে পুরো পৃথিবীতে পুঁজিবাজার চলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যালিটির ওপর। যারা শেয়ার ব্যবসা করেন, যারা শেয়ার কেনেন, যারা শেয়ার বিক্রি করেন, তারা প্রথমে দেখে নেন একটা কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল  ইন্ডিকেটরগুলো কোন অবস্থায় রয়েছে, সে কোম্পানিটির প্রোডাক্ট কতটা মার্কেট ওরিয়েন্টেড, কোম্পানির বিজনেস গ্রোথ কি, বিজনেস এক্সপানশানের সম্ভাবনা দেখেন। বিশেষ করে ম্যানেজমেন্ট কতটুকু অ্যাকটিভ ও কর্তব্যপরায়ণ তা যাচাই করে। এছাড়া টেকনিক্যালিটিসগুলো যাচাই করে তবেই বিনিয়োগ করেন।এগুলো বিচার করে পুঁজিবাজারে যদি কেউ বিনিয়োগ করেন, তাহলে তার লোকসান হবে না। ফলে শেয়ার মার্কেট কিন্তু নির্ভর করে কোম্পানি ও যারা বিনিয়োগ করছেন তাদের ওপর।


তার মানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন প্রভাব বাজারে নেই?


আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংক হিসেবে যে কাজটা ইতোমধ্যে করেছে, তা হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের পরিশোধিত মূলধন ও রিজার্ভের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক, বাণিজ্যিক, কৃষি বা শিল্প বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অর্জন বা ধারণ করতে পারে- এমন নির্দেশনা দিয়েছে। আমি মনে করি, এটা যথেষ্ট। কারণ শেয়ার মার্কেট মূলত তালিকাভুক্ত কোম্পানি, তার স্ট্রেন্থ ফান্ডামেন্টাল, টেকনিক্যালিটিস ও বিনিয়োগকারীরা। অর্থাৎ যারা বাই ও সেল করবে, তাদের মানসিকতার ওপর নির্ভর করে।

দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?


আমাদের জিডিপি’র দিকে লক্ষ্য করুন, সরকারের পক্ষ থেকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৭.২ এর লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কেউ কেউ বলছে ৭.২ হবে না, একটু কম হবে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ৭.২ হবে না ৬.৫ হবে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বলছে ৬.৫ থেকে ৬.৭ এর মধ্যে থাকবে। আসল কথা হলো, যে যাই বলুক না কেন আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিন্তু খুবই চমৎকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে এটা খুবই চমৎকার। মাঝে মাঝে অতি উৎসাহী যারা প্রশাসনে রয়েছেন, তারা বলেন, জিডিপি ৭.৮ বা ৮ ও হতে পারে। এ কথাটাও কিন্তু অসত্য না। যদি আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়াতে গ্যাসের সংযোগ দিতে পারি, আমরা যদি  বিদ্যুতের সংযোগ দিতে পারি, তবে আমাদের জিডিপির গ্রোথ আরও প্রশংশনীয় হবে। চীন বা ওই লেভেলের যে গ্রোথ রয়েছে, সেই লেভেলের গ্রোথ হওয়া সম্ভব।তার মানে আপনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের কথা বলছেন-যে কোনো কারণেই হোক না কেন- আমাদের দেশে যারা উদ্যোক্তা রয়েছেন, তাদের কিন্তু আমরা সেভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে পারছি না। কিন্তু বর্তমান সরকার ১০০টি ইকোনমিক জোন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫-১৬টি ইকোনমিক জোন ইতোমধ্যে কার্যক্রমে এসেছে। আরও অনেকগুলোর লাইসেন্স হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ইকোনমিক জোনগুলোতে উদ্যোক্তাদের গ্যাস -বিদ্যুতের নিশ্চয়তা থাকবে বলে মনে করি। ইকোনমিক জোনের মাধ্যমেও যদি উদ্যোক্তাদের গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তবে আগামীতে আমাদের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে।

আর্থিক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কি কি?

আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কু-ঋণ। এটা দূর করতে আমরা যারা ফাইন্যান্স করি তারা যদি লোন কিংবা অ্যাসেট দেওয়ার সময় আরও একটু সর্তক হই, তবে আমাদের কু-ঋণের পরিমাণ কমে যাবে। কু-ঋণ যেগুলো হয়ে গেছে, সেগুলো রিকভারি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।


ঋণ প্রদানে সতর্কতার কথা বলেছেন। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কি কোনো নজরদারি নেই?
সতর্কতা মানে হলো ঋণ প্রদানে আরও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। হ্যাঁ, এটা সত্য বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের নজরদারি করছে। কিন্তু আমরা যারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে আছি, তাদের আরও সচেতন হতে হবে। এতে করে কু-ঋণ কমে যাবে।


আর্থিক ও ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?


পৃথিবীর সব দেশেই সেন্ট্রাল ব্যাংক রয়েছে। কিন্তু আমাদের সেন্ট্রাল ব্যাংক একদিকে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে, ঠিক একইভাবে পথনির্দেশকের ভূমিকাও পালন করছে। এত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে বলেই ২০০৭ সালে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও আমাদের অর্থনীতিতে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। এছাড়া ২০১০ সালেও দূর প্রাচ্যের দেশগুলোতে যে ধস এসেছিল আমরা তা থেকে বাঁচতে পেরেছি।

এতকিছুর পরও তো রিজার্ভ চুরি হয়ে গেল-


আমাদের রির্জাভের যে ঘটনা ঘটে গেছে, ঘটনা ঘটবার পরপরই যদি অ্যাকশনে যাওয়া হত, তাহলে চিত্রটা অন্যরকম হতে পারত। এ একটা বিষয় ছাড়া অন্যান্য বিষয়গুলোতে কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের অভিভাবক ও পথপ্রদর্শকের ক্ষেত্রে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।


বর্তমানে অর্থঋণ আদালতে প্রায় ৫০ হাজার মামলা বিচারাধীন, যার বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। এ বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?


অর্থ ঋণ আদালতের পক্ষ থেকে আরও দ্রুত মামলার সিদ্ধান্তগুলো দেওয়া উচিত। যদিও তাদের লোকবলের সংকট রয়েছে। ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থাও (আইএমএফ) খেলাপী ঋণ আদায়ে বিদ্যমান আইন সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অর্থ ঋণ আদালতের মামলার ৯০ শতাংশই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জয়ী হচ্ছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের রিট কিংবা স্থগিতা দেশের কারণে তা আটকে যাচ্ছে।
দেখুন রায়ের পর যেন তা অতিদ্রুত পরিপালন করা হয় আদালত থেকে এমন নিদের্শনা দিতে হবে। পাশাপাশি যে অনিয়ম করেছে, তাকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি সাজাও দিতে হবে।এখন দ্রুত আইনে বিচার হচ্ছে, ছয় মাসের মধ্যেই বিচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পাশাপাশি বাস্তবায়নের জন্য আইন থাকতে হবে যে, স্বল্প দিনের মধ্যে ওই সংস্থার মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া যদি ঋণ গ্রহীতার ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়, তার সাজার বিধানও থাকতে হবে। বড় বড় ঋণ খেলাপী যারা তারা কিন্তু আইনের মারপ্যাচে নিজেদের নিরাপদ রাখছে। কোনোভাবে বিদেশ চলে যাচ্ছে, তাদের আইনের ঘরে আনা যাচ্ছে না।

তারপরও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ খেলাপী প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারস্ত হচ্ছে নুতন ঋণ দিতে। অন্যদিকে, অনেক সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তা একটু অর্থায়ন সুবিধা পেতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমনটা কেন হচ্ছে?


সত্যিকার অর্থে আমরা ছোট ছোট গ্রাহকদের নিয়ে বেশি কাজ করি। আমাদের বিনিয়োগের ৩৫ শতাংশই এসএমই খাতে। নতুন যারা উদ্দমী ও অবশ্যই যাদের ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন লোকদেরই আমরা ঋণ দিই। কারণ, অভিজ্ঞতা না থাকলে সে তার পুঁজিও হারাবে, আমাদেরটাও। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে প্রধান্য দেওয়া হয়। যেমন ধরুন, কেউ ব্যবসা শুরু করল কিন্তু মেশিনারিজ সম্পর্কে তার কোনো ধারণ নেই। মেশিনারিজগুলো কোনো দেশ থেকে আমদানি করতে হবে, দাম কত, উৎপাদন ক্ষমতা কেমন, কোন ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করলে কেমন উৎপাদন খরচ পড়বে, পণ্য বিপনণ ব্যবসা কেমন হবে তা সম্পর্কে ধারণা না থাকলে কাউকে দিয়ে ব্যবসা হবে না। তাই আগে উদ্যোক্তাকে ব্যবসা সম্পর্কে জানতে হবে, ব্যবসায় সম্পৃক্ত হতে হবে। তারপরে আমরা ঋণ দিলে সে ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করতে পারবে।


ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রে সুদের হার কমছে। এতে করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কি?


আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমি মনে করি, এ সিদ্ধান্তে ব্যাংকিং সেক্টরে কোনো সমস্যা  হবে না। দেখুন, রেট অব ইন্টারেস্ট কখন বেড়ে যায়?  যখন ঋণ খেলাপী বেশি হয়ে যায় তখন। উদাহরণ স্বরূপ আপনি যদি ১ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ ইন্টারেস্ট পান অর্থাৎ এক বছরে আসে ১০ হাজার টাকা। এটা কিন্তু নিট আয় না। এই ১০ হাজার টাকার মধ্যে আপনার যাবতীয় ব্যয় আছে, ট্যাক্স আছে। সব ব্যয় বাদ দিলে আপনার মুনাফা হয় লাখে ১ বছরে ১ হাজার টাকা। কিন্তু যদি ১ লাখ টাকা খেলাপী হয়ে যায়। তার পুরো টাকাটাই ১ হাজার টাকা করে কাভার করতে হলে ১০০ টা অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু লোনগুলো যদি ভাল হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রেট অব ইন্টারেস্ট আরও কমবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, সুদের হার আরও কমা উচিত। এতে করে ব্যাংকাররা আরও সর্তক হবে। কু-ঋণের হারও কমবে।
Source :
http://www.poriborton.com/interview/68080   

Attachment :   Download