info@first-finance.com.bd   
  EMI Calculator  09678-888999

ফার্স্ট ফাইন্যান্সের যাদুর কাঠি মহসিন

ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে ২০০৩ সালে লিস্টেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়ে ঢাকা (ডিএসই) চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সঙ্গে যুক্ত হয়

হঠাৎ ২০১৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির ছন্দপতন শুরু বড় ধরনের ব্যবসায়িক মন্দায় পড়ে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ফার্স্ট ফাইন্যান্স

চার বছর পর ২০১৭ সালের শুরু থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে দেশের আর্থিক খাতের এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি। বলতে গেলে রাতারাতি দেশের ব্যাংকিং জগতের আইকন মো. মহসিন মিয়ার নেতৃত্বে লোকসানে ধুঁকতে থাকা ফার্স্ট ফাইন্যান্স মুনাফার মুখ দেখে

ফার্স্ট ফাইন্যান্সের এমন ব্যবসায়িক উত্থানের ক্যারিশমা ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে প্রতিষ্ঠানটির এমডি সিইও মো. মহসিন মিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল পরিবর্তন ডটকম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফরিদ আহমেদ নিজস্ব প্রতিবেদক জাহিদ সুজন। ছবি তুলেছেন ফটোসাংবাদিক ওসমান গণি। ফার্স্ট ফাইন্যান্সে মহসিন মিয়ার যাদু স্পর্শের বিস্তারিত শুনুন তার নিজের মুখেই;

 

আপনার কাছে কী এমন যাদুর কাঠি আছে যা দিয়ে লোকসানে ধুঁকতে থাকা ফার্স্ট ফাইন্যান্সকে মুনাফায় নিয়ে আসলেন?

 দেখুন, আমার কাছে নিয়ম-কানুনই মুখ্য। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সবার আগে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের যত রকম কম্পালায়েন্স কালচার রয়েছে, যেসব বিধিবদ্ধ নীতিমালা রয়েছে, সেগুলোকে পরিপূর্ণরূপে গাইডলাইন হিসেবে মেনে নিয়ে কাজ করছি। প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা কমিটি করেছি। কমিটিগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে সাজানো হয়েছে।

 কিভাবে কমিটিগুলো সাজানো হয়েছে?

ধরুন, কোনো গ্রাহক ঋণ চাইলেন, ঋণ দেওয়ার আগে আমরা সবার আগে খুঁজে বের করি ভাল অ্যাসেট। ভাল ঋণ, ভাল লিজ, এগুলো যাচাই-বাচাই করার জন্য আমি ক্রেডিট রিক্স ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) কমিটি গঠন করেছি। সিআরএম মাধ্যমে একটা প্রস্তাব যখন ব্রাঞ্চ থেকে আসে, সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওই ব্যবসার সুবিধাগুলো (মেরিট) খুঁজে বের করা হয়

ব্যবসায়ের সুবিধাগুলো বের করার পর ধরুন আমরা নির্দিষ্ট গ্রাহককে ঋণ দিব। এরপর ওই গ্রাহককে ঋণ দিতে গেলে কিছু কোল্যাটেরালের (সহযোগী জামানত বা জমিজমা, বিল্ডিং হতে পারে) বিষয় আসে। কিছু সিকিউরিটির বিষয় আসে। সিকিউরিটিগুলো যথাযথ কিনা কোল্যাটেরালগুলো যথাযথ কিনা সেগুলো যাচাইয়ের জন্য আলাদা একটা ক্রেডিট অ্যাডম্যানিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট গঠন করেছি। এই ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট ফার্স্ট ফাইন্যান্সে আলাদাভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে

এরপরে মনে করুন, ঋণ দেওয়া হয়ে গেল। যিনি ঋণ নিয়ে গেলেন, তিনি সঠিকভাবে অর্থের ব্যবহার করছেন কিনা, ব্যবসা ঠিকমত করছেন কিনা, নাকি কোনোভাবে ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার হয়ে গেল? এগুলো দেখার জন্য আলাদা মনিটরিং টিম করা হয়েছে। এই কমিটি ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে

এরপর কোনো গ্রাহক যদি ইচ্চাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করে বা খেলাপি হয়ে যায় তখন অর্থ উদ্ধারের জন্য একটা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় চলে আসে। এজন্য আমরা দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছি। এর মাধ্যমে আমরা লিগ্যাল ডিপার্টমেন্টকে সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করেছি
ঋণ বিতরণ সঠিকহারে আদায়ের পর মনে করুন ব্যবসা হয়ে গেল। সেখান থেকে সুন্দরভাবে মুনাফাসহ অর্থ ফেরত আসল

তারপরে আসে অ্যাকাউন্টসের বিষয়। অ্যাকাউন্টস ঠিক করার জন্য আমরা অ্যাকাউন্ট ডিভিশনের দিকে নজর দিয়েছি। অ্যাকাউন্টস সুন্দর করার জন্য বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (বিএএস) ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (বিএএস) ফলো করতে হয়। আমরা সব নীতিমালা অনুসরণ করে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগ দিয়েছি
আরও বিষয় আছে। যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। আমরা তাও নতুনভাবে সাজিয়েছি। পাশাপাশি ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের জন্য আমরা ফ্রন্ট অফিস, ব্যাক অফিস তৈরি করেছি। মূলত বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট বিন্যস্ত করার ফলে আমরা ইতোমধ্যেই সুফল পেতে শুরু করেছি। সুফল দীর্ঘদিন ফার্স্ট ফাইন্যান্স পেতে থাকবে

 

বর্তমানে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ব্যবসায়িক অবস্থা কেমন?

 ভুল-ত্রুটি যাই বলি না কেন বা যেকোনো কারণেই হোক, আমাদের বিগত দিনের কিছু সমন্বয়ের বিষয় ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে আমরা গত প্রান্তিকে ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সমন্বয় করেছি। এ টাকা পুরোটাই মুনাফা থেকে এসেছে। বিশাল এ অর্থ সমন্বয়ের পরও এপ্রিল থেকে জুন কোয়ার্টারে ফার্স্ট ফাইন্যান্স ৪ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা মুনাফা করেছে। আমরা আশা করছি, এ বছর যখন শেষ করব, তখন আরও ভাল মুনাফা নিয়ে ব্যবসা শেষ করতে পারব।

 

 

রাতারাতি লোকসান থেকে বড় অংকের মুনাফায় আসলেন কিভাবে?

আমরা যে নতুনভাবে ব্যবসায়িক কাঠামোর পরিবর্তন করেছি, ব্যবসার বিন্যাস করেছি। এর ফলে নতুনভাবে আমরা রিকভারি শুরু করেছি। যে ঋণগুলো আমার আগে দিয়েছি, সেগুলো রিকভারির জন্য আমরা নতুন করে ড্রাইভ দিয়েছি। রিকভারির জন্য আমরা একটা সেন্ট্রাল রিকভারি সেল গঠন করেছি। এখন প্রত্যেকটি অ্যাকাউন্টের ওপর আমাদের নজর আছে। আমরা যার যার জায়গায় থেকে বলে দিতে পারব, কোন অ্যাকাউন্টের কাছে কত টাকা পাওনা আছে। গ্রাহক সর্বশেষ কত তারিখে ইএমআই প্রদান করেছেন অথবা ইএমআই দিতে কেন দেরি হচ্ছে, কবে নাগাদ গ্রাহক কিস্তি পরিশোধ করবেন? এর সবগুলোই আমাদের নখদর্পণে

 

কতগুলো শাখা নিয়ে কাজ করছেন?

দেখুন, আমাদের মাত্র ৬টা শাখা। আমরা প্রতিদিন প্রত্যেকটা শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি। কে কত টাকার ডিপোজিট আনলেন, কিভাবে ইএমআই সংগ্রহ করা হচ্ছে কিভাবে প্রস্তাবনা তৈরি করছে- সব খবর আমরা রাখছি

 

বর্তমানে কোন কোন খাতে ঋণ দিচ্ছে ফার্স্ট ফাইন্যান্স?

ফার্স্ট ফাইন্যান্স দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের আর্থিক চাহিদা পূরণে ৬টি শাখার মাধ্যমে ঋণ দিয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে লিজ অর্থায়ন, মেয়াদী অর্থায়ন, আবাসন ঋণ, মেয়াদী আমানত রশিদ, মাসিক সঞ্চয়ভিত্তিক মেয়াদী আমানত, আবাসন প্রকল্প ঋণ, করপোরেট ঋণ, কার্যকরি মূলধন ঋণ, ক্ষুদ্র মাঝারি ঋণ, নারী উদ্যোক্তা ঋণ, গাড়ি ঋণ, হায়ার পারচেজ, ব্রিজ ফাইন্যান্স, ইক্যুইটি ফাইন্যান্স, স্ট্রাকচার্ড ফাইন্যান্স সিন্ডিকেটেড ফাইন্যান্সে আমরা নিয়মিত অর্থায়ন করছি

 ফার্স্ট ফাইন্যান্সের বিনিয়োগের বড় অংশ রয়েছে সেবা খাতে (সার্ভিস সেক্টর)আগামীতে কোন কোন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

সার্ভিস সেক্টরে বেশি বিনিয়োগ করছি, এটা পুরোপুরি ঠিক না। আমরা ট্রেড ইন কমার্সে, গামেন্টস সেক্টরের নিট ওয়্যারেও বিনিয়োগ করছি। এছাড়া টেক্সটাইলে বিনিয়োগ করছি, জুট প্রডাক্ট, ফুড প্রডাকশন, প্লাস্টিক, লেদারে বিনিয়োগ করছি। বিশেষ করে এসএমইতে বিনিয়োগ আমরা অনেক বেশি করেছি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের প্রশংসাও করেছে। আমাদের মোট বিনিয়োগের ৩৫ শতাংশই এসএমই খাতে বিতরণ করা হয়েছে। আমাদের টোটাল আউটস্টেন্ডিং ৯৮২ কোটি ২০ লাখ টাকার মধ্যে ৩১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকাই বিনিয়োগ করেছি এসএমই খাতে

মোট কথা আমরা সবগুলো সেক্টরেই বিনিয়োগ করছি। এর পেছনে একটা কারণ আছে। যদি কোনো সেক্টরে শক এসে যায়, আমরা যেন অন্য খাত দিয়ে সেটি সহজেই ওভারকাম করতে পারি

গত তিন মাসে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারের চাহিদা বেড়েছে। হঠাৎ আপনাদের শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার কারণ কি?

ঠিক বলেছেন। মে মাসে আমাদের শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৫.৮৫ শতাংশ। জুন মাসে তা বেড়ে হয় ১৬.৮৭ শতাংশ। জুলাই শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ১৯.৫১ শতাংশ। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিগত কয়েক বছরে আমাদের ব্যবসায়িক অবস্থা যে খারাপ ছিল, তা থেকে আমরা ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছি। যারা বিচক্ষণ শেয়ার মার্কেটিয়ার তারা তা বুঝতে পেরেছেন

ইতোমধ্যে একটা স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফার্স্ট ফাইন্যান্স দাঁড়িয়ে গেছে। এজন্যই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ক্রমাগত বাড়ছে

 

আপনারা তো এখনও জেড ক্যাটাগরিতে আছেন-

জেড ক্যাটাগরি থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা দ্রুত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে চাইছি। তবে আমরা এজিএম করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। জনৈক শেয়ারহোল্ডার মাত্র ১০টি শেয়ার কিনে অসৎ উদ্দেশ্যে রিট করে আমাদের এজিএম স্থগিত করেছিলেন। আমরা সেটা কাটিয়ে উঠেছি

ওই শেয়ারহোল্ডার পরে আরও একটি স্থগিতাদেশ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করেছেন। আমরা সেটাও কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি। সেটা যদি কাটিয়ে উঠতে পারি, তবে আমরা সরাসরিবিক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হব। আরবিক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হতে পারলে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের যে ক্রেডিট লাইন আছে, তা পুনরায় খুলে যাবে। তখন আমাদের ক্রেডিট লাইন ওপেন হবে। ক্রেডিট লাইন ওপেন হলে ডিপোজিটের অভাব থাকবে না। যখন ডিপোজিটের অভাব থাকবে না, তখন আমরা আরও অধিক মাত্রায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারব। এর ফলে যখন আমরা পুরোদমে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারব তখন আমাদের শেয়ার প্রাইজ কোথায় যাবে সেটা সময়ই বলে দিবে। ইনশাহআল্লাহ

 

সব জটিলতা দূর করে এজিএম কবে নাগাদ হতে পারে?

আমরা আগামী ৩০ আগস্ট বার্ষিক সাধারণ সভার তারিখ নির্ধারণ করেছি। কোনো অঘটন না ঘটলে ওইদিনই এজিএম হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে ওই স্থগিতাদেশের ওপর। আশা করছি, এই সমস্যা আমরা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারব

 

Source: 

http://www.poriborton.com/interview/67687